ঋণ সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কৌশল

বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের দিকে ঝুঁকছে বিশ্বব্যাংক

ঋণ সক্ষমতা বাড়াতে নতুন আর্থিক কৌশলের দিকে ঝুঁকছে বিশ্বব্যাংক।

ঋণ সক্ষমতা বাড়াতে নতুন আর্থিক কৌশলের দিকে ঝুঁকছে বিশ্বব্যাংক। এ কৌশলের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন দেশের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে ঋণঝুঁকি স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বহুপক্ষীয় সংস্থাটি। কৌশলটির কার্যকারিতা প্রমাণ হলে পেনশন ফান্ড ও বীমা কোম্পানির মতো উদীয়মান বিভিন্ন তহবিলের সঙ্গে অংশীদারত্বের পথে হাঁটবে ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানটি।

সাধারণত উদীয়মান বাজারের বেসরকারি খাতে ঋণ দিয়ে থাকে বিশ্বব্যাংকের শাখা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। চলতি মাসে এসব অঞ্চলে ৫০ কোটি ডলারের ঋণঝুঁকি কয়েকটি ভাগে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করেছে আইএফসি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এফটিকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানান, বিশ্বব্যাংকের সক্ষমতা বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যবহারসংক্রান্ত পরিকল্পনার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হিসেবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

এ ধরনের চুক্তি থেকে কী পরিমাণ অর্থ আসবে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত নন অজয় বাঙ্গা। তবে নিয়মিতভাবে আইএফসির বিতরণ করা ঋণের কিছু অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করছে বিশ্বব্যাংক। ফলে পেনশন ফান্ড ও বীমা কোম্পানির মতো বড় বেসরকারি তহবিল এ লেনদেনে নিয়মিত অংশ নিতে থাকবে।

বিশ্বব্যাংকের এ উদ্যোগের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ অংশীদার দেশের অনেকগুলোই এখন অর্থনৈতিক ধীরতায় ভুগছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বড় কয়েকটি অংশীদার তহবিল সরবরাহ কমিয়ে দেয়। নতুন তহবিল চাওয়ার আগে বিশ্বব্যাংককে নিজস্ব ব্যালান্সশিটের ব্যবহার বাড়াতে হবে, অর্থাৎ বিদ্যমান সম্পদ ও ঋণের সীমা আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।

নতুন এ উদ্যোগে অন্যান্য পদ্ধতির সঙ্গে কোলাটেরালাইজড লোন অবলিগেশনের (সিএলও) ধারণা ব্যবহার করছে আইএফসি। প্রথমবার ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় সিএলওর ব্যবহার। মূলত লাভজনক করপোরেট ঋণদাতাদের জন্য ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি হিসেবে এটি বিকশিত হয়েছে। আইএফসির উদ্যোগটিতে ঋণ দেয়া হচ্ছে স্থানীয় মুদ্রায়, যা গ্রহীতা দেশগুলোর জন্য সুবিধাজনক। গ্যারান্টি হিসেবে বিশ্বব্যাংকের অংশগ্রহণ থাকায় বিনিয়োগ ঝুঁকিও কম এতে।

অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ব্যালান্সশিটে ঝুঁকি কমানো ও ব্যাংকের অর্থের নতুন ব্যবহার নয়, বরং উদীয়মান বাজারগুলোয় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে আরো উৎসাহদান। কারণ এ বাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ বিলিয়ন থেকে প্রত্যাশিত ট্রিলিয়ন ডলারের দিকে প্রবাহিত হয়নি।’

পেনশন ফান্ড ও বড় বিনিয়োগ সংস্থাগুলো একা উন্নয়নশীল দেশে বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারছে না। তারাও চাইছে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো এ বিভিন্ন খাতের ঋণকে একত্র করে তাদের সুবিধা করে দিক। এতে বেসরকারি তহবিলগুলো সহজে বিনিয়োগ করতে পারবে। আবার বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো মূলধনপ্রবাহ বাড়াতে আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড বিক্রির ওপর নির্ভর করে। তারা সাধারণত সিএলওর বাজারে প্রবেশ করে না।

বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো সরকারি প্রকল্পে অর্থায়ন করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভাগ পাওয়া কঠিন। বিভিন্ন কারণে সেখানে বিশ্বব্যাংকের মতো শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো সুবিধা পেয়ে থাকে। এখন বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার ফলে এ বাড়তি সুবিধা পাওয়া থেকে ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি তাদের সে দিকেই নিচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

দুই বছরের পরিকল্পনার ভিত্তিতে সিএলও-ভিত্তিক নতুন লেনদেন শুরু করেছে আইএফসি। এতে ব্যবহার হচ্ছে বিদ্যমান করপোরেট ঋণ, যা মার্কিন ডলার ও বাজারনির্ভর ভ্যারিয়েবল বা ফ্লোটিং রেটের সঙ্গে যুক্ত। এ লেনদেনে ৫৭ গ্রাহক রয়েছে, যার প্রায় ৪২ শতাংশ ধারণ করে আছে তুরস্ক, মেক্সিকো, ব্রাজিল, বাংলাদেশ ও মিসর।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এ ধরনের উদ্যোগে অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকেরও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) সিঙ্গাপুরের ক্লিফোর্ড ক্যাপিটালের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এ ধরনের ঋণ দিয়ে থাকে। তাদেরও লক্ষ্য বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা। এআইআইবি ও ক্লিফোর্ড সাধারণত উন্নয়নশীল দেশের অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য সিকিউরিটিজ ইস্যু করে থাকে।

বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য শাখার মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে ঋণ দেয় ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইবিআরডি)। দরিদ্র দেশগুলোয় ঋণ বিতরণ করে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ)। এসব প্রতিষ্ঠানের সরকারি ঋণগুলোকে সিএলও বা সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভাগ করা কঠিন বলে জানান অজয় বাঙ্গা। কারণ ঋণ বিতরণের রয়েছে আলাদা আলাদা শর্ত। তবে ভবিষ্যতে যদি চুক্তির শর্তগুলো একই রকম করা যায়, তাহলে বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য ইউনিটও একইভাবে কাজ করতে পারবে।

তবে সিএলওর মতো আর্থিক পদ্ধতি ব্যবহার করা মানে দাতাদের কাছে বিশ্বব্যাংক নতুন তহবিল চাইবে না, এমন নয়। এটিকে সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়ানোর একটি উপায় হিসেবে দেখছেন অজয় বাঙ্গা। আইডিএ গত বছর দাতাদের কাছ থেকে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংক এখনো প্রচলিত পদ্ধতিতে অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা রাখে।

কিন্তু বড় পশ্চিমা দাতা দেশগুলোকে এখন বাজেটের সীমা মেনে নিতে হচ্ছে। এসব দেশের অর্থনীতিতে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা খরচ ও অন্যান্য চাহিদা। অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘আমি আরো তহবিলের জন্য অনুরোধ করতে লজ্জা পাই না। কিন্তু এটাও মনে করি না যে দাতারা অর্থ জোগান দেবে, এ আশা করাই একমাত্র কৌশল।’

আরও